ধুনটের পাখিবাড়ি

প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগে তারা ঝাঁক বেঁধে উড়ে যায় খাবারের সন্ধানে। দুপুরের পর থেকেই ফিরে আসতে শুরু করে। আশ্রয় নেয় বিভিন্ন গাছের মগডালে। সেখানেই তাদের বাসস্থান, অভয়াশ্রম। এসব পাখি এখানেই বাসা বেঁধে নিরাপদে বাচ্চাদের জন্ম দেয়। এমন দৃশ্য চোখে পড়ে বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নে যমুনা নদীর ভাঙন জনপদ এলাকার মাধবডাঙ্গা গ্রামে রবিউল হাসান ওরফে ভুটান সরকারের বাড়িতে।

৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে সরেজমিনে দেখা গেল, ধুনট উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার পূর্বে যমুনা নদীর পশ্চিম পাশে পাখিদের অভয়াশ্রম রবিউল হাসানের সেই সূর্যমুখী বাড়ি। প্রায় চার একর আয়তনের বাড়িটির সামনে রয়েছে দুটি পুকুর। বাড়ির সামনে উঠান। পুকুরপাড়ে রয়েছে মেহগনি, তেঁতুল, কড়ইসহ নানা জাতের গাছ এবং পেছনের দিকে রয়েছে বিশাল আকারের বাঁশবাগান। সেসব জায়গাতেই হাজার হাজার পাখির অভয়াশ্রম। প্রতিদিন পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে বাড়ির চারপাশ। এসব পাখি প্রতিবছর গ্রীষ্মের শুরুতে সদলবলে এসে গাছের মগডালে বাসা বাঁধে, সেখানে বাচ্চা ফোটায়। এরপর বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত পেরিয়ে শীত এলেই বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। এলাকার মানুষের কাছে এটি পাখিবাড়ি নামে পরিচিত।

পাখিবাড়ির বাসিন্দা রবিউল হাসান বললেন, ২০-২২ বছর আগে চৈত্র মাসে হঠাৎ করে একদিন বিকেলবেলা একঝাঁক পাখি উড়ে এসে তাদের বাড়ির গাছের ডালে বসে। এরপর থেকে প্রতিদিন বাড়তেই থাকে পাখির সংখ্যা। প্রথম দিকে পাখিগুলো আশ্রয় নেয় বাড়ির সামনের দিকে পুকুরপাড়ে, একটি তেঁতুলগাছে। সেখানেই বাসা বেঁধে বাচ্চা ফোটায়। একসময় ছানাগুলো বড় হয়ে বাড়ির বিভিন্ন গাছে বাসা বাঁধে। শীত আসার আভাস পেয়ে একদিন সব একসঙ্গে উড়াল দিয়ে চলে যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পানকৌড়ি, বক, ঘুঘু, শালিকসহ বিভিন্ন জাতের দেশীয় পাখি।

ভুটান সরকারের বড় ভাই আবু হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমাদের এই পুরোনো বাড়িটিতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি গাছের ডালে বাসা বেঁধে আশ্রয় নেয়। প্রথম দিকে পাখিদের মলের গন্ধ খারাপ লাগত। এখন পাখিদের সঙ্গে বাড়ির লোকজনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অজানা এক মায়ার টান তৈরি হয়েছে এদের সঙ্গে। প্রতিবছর পাখিরা শুধু এ বাড়িতেই বাসা বাঁধে। এই বাড়ির সীমানা ছেড়ে অন্য কোনো বাড়ির গাছে বসে না। এসব দেখে ভালো লাগে আমাদের। এখন পাখিরা চলে গেলে কষ্ট পাই। পাখিবাড়ি নামে পরিচিত এই বাড়ি দেখার জন্য প্রতিদিন দূরদূরান্তের অনেক মানুষ আসেন। পাখি দেখতে আসা অতিথিদের বলে দেওয়া হয়, যেন তাঁরা পাখিদের বিরক্ত না করেন। তবে মাঝেমধ্যে শিকারি এসে একটু ঝামেলা করতে চায়।

এ বাড়িতে পাখি দেখতে আসা আহসান হাবিব বললেন, যমুনা নদীর ভাঙন জনপদ এলাকায় এই বাড়ি পাখিদের অভয়াশ্রম হয়েছে। এ রকম দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় না। গাছের সবুজ পাতার ভেতর ডালে ডালে বসা নানা রঙের অসংখ্য পাখির ওড়াউড়ি এবং বিচিত্র আওয়াজের ডাকাডাকিতে প্রাণটা ভরে ওঠে।

ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন তালুকদার বলেন, পাখিবাড়ির প্রতি সব সময় আলাদাভাবে নজর রাখা হয়েছে। কেউ পাখি শিকার করতে এলে তাদের আটক করে পুলিশকে জানানোর জন্য পাখিবাড়ির লোকজনকে বলা হয়েছে।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/974788/%E0%A6%A7%E0%A7%81%E0%A6%A8%E0%A6%9F%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%96%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9C%E0%A6%BF

বর্ষার পাখি কোড়া

ছবির পাখি দুটি কোড়া। ভরা বর্ষায় ভরা যৌবন নিয়ে এরা প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। পোষা মোরগের মতো লড়াইয়ে লিপ্ত হয়। প্রজনন মৌসুমে একটি পুরুষ কোড়া অন্য পুরুষকে দুচোখে দেখতে পারে না। প্রতিটি পুরুষই তার রাজ্যসীমানা নির্ধারণ করে নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা দেয়। গলা ফাটিয়ে ডেকে ডেকে সে মাঝেমধ্যেই নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়।
ছবির কোড়া দুটির বাঁ দিকেরটা বসে আছে, ডান দিকেরটা দাঁড়ানো। তিন মিনিটের লড়াইয়েই সে প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দিয়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বী আত্মসমর্পণ করেছে। বিজয়ী কোড়া মেয়ে কোড়াকে নিয়ে দিন কাটাবে। বাসা হবে, ডিম হবে, ছানা হবে।
ভরা বর্ষায় ধানখেত-পাটখেত-হোগলাবনসহ হাওর-বাঁওড়ের বুকে কোড়ার গান বা ডাক শোনা যায়। এদের লড়াইটা চোখ চেয়ে দেখার মতো। লড়াইয়ের পূর্ব মুহূর্তে এরা ঠিক পোষা দেশি মোরগের মতো মুখোমুখি হয়, চোখে রাখে চোখ। প্রতিদ্বন্দ্বীর অসতর্ক মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঠোঁট চালায়, পা দিয়ে লাথি কষে, বর্মে বর্ম ঠেকিয়ে দুটিতে পাঁঠা-ছাগলের মতো ঠেলাঠেলি যেমন করে, তেমনি একটু পিছিয়ে এসে ছাগলের কায়দাতেই একটু লাফিয়ে উঠে পরস্পরের শক্ত বর্মে আঘাত করে। সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো প্রতিপক্ষের পায়ের ৪টি লম্বা নখর নিজের নখরে কষে আঁকড়ে ধরা। এ অবস্থার সুযোগ নিয়ে যেকোনো মানুষ দৌড়ে গিয়ে ধরে ফেলতে পারবে দুটিকেই।
পোষা কোড়া দিয়ে বুনো কোড়া শিকার একসময় গ্রামবাংলার কৃষকদের কাছে ছিল শৌখিন শিকার। পোষা কোড়া ছেড়ে দিয়ে ও অন্যান্য কৌশলে পোষা কোড়া দিয়েই বুনো কোড়া শিকার করা হতো। এখন আবাসভূমি অনেক সংকুচিত হয়েছে, নিরাপদে ডিম-ছানা তোলা দায়। সারা দেশেই চিংড়ি অথবা সাদা মাছের খামার। জলভরা ধান-পাটখেত উধাও। ওরা তাই বেদিশাই বলা যায়। ১৯৭০ সালে বৃহত্তর খুলনায় যে পরিমাণ কোড়া ছিল, ২০১৬ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ ভাগে।
এই পাখিদের আরেক নাম জলমোরগ। বাগেরহাটে পুরুষটি কোড়া, মেয়েটি কুড়ি, ছানারা কুড়কুড়ি বা গুড়গুড়ি নামে পরিচিত। ইংরেজি নাম Water Cock. বৈজ্ঞানিক নাম gallicrex chinerea. পুরুষটির মাপ ৪৩ সেমি, মেয়েটির ৩৬ সেমি। ওজন গড়ে ১৭০-১৯৫ গ্রাম।
এমনিতে মেয়ে-পুরুষের রং একই রকম। পিঠের উপরিভাগ ঘন-বাদামি, বুক-পেট-গলা-ঘাড় বাফ্ রঙা। গলা-বুক-পেট ও শরীরের দুপাশজুড়ে অসংখ্য আড়াআড়ি দর্শনীয় কালো কালো সরু টান। বর্ম হলুদাভ। তবে বর্ষা ঋতুতে শরীরে যৌবন ভর করলে পুরুষটির রং খুবই কালো হয়।
মূল খাবার এদের নানা ধরনের জলজ পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, জলজ ঘাসের বীজ-ধান-কাউন-চিনাদানা-কচিপাতা, শিকড়সহ ছোট শামুক। এরা ধানখেত-পাটখেতের পাখি। বর্ষা ঋতুর পাখি। বর্ষাকালেই এরা জলভরা খেত-সাম্রাজ্যের মহারাজা। শ্রাবণ-ভাদ্রে এদের প্রচণ্ড ডাকাডাকিতে মুখরিত হয় চরাচর। বাসা করে খেতের আইলের ওপর। বাসা থেকে নামার সময় মেয়ে পাখিটি প্রতিবারই ঘাস বা ধান পাতা দিয়ে বাসার ডিম ঢেকে রেখে যায়।
ডিম পাড়ে ৩-৬টি, ৭-৯টিও হয়। ৪টির সংখ্যাই বেশি। মেয়েটি একাই তা দেয় ডিমে। ডিম ফোটে ২০-২৪ দিনে। মুরগির তায়েও ফোটে ডিম। সময় ওই ২০-২৪ দিনই। ছানারা বাসা থেকে নেমে যখন মায়ের পেছনে পেছনে হাঁটে তখন অদ্ভুত সুন্দর দেখায়।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/975445/%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%96%E0%A6%BF-%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%BE

শিকড়ে প্যাঁচা

পাখি সংরক্ষণের কাজে গত আগস্ট মাসে তেঁতুলিয়ায় গিয়েছিলাম। অসহনীয় গরমের কারণে গাছের ছায়া খুঁজেছি, সময় কাটিয়েছি মহানন্দা নদীর পারে। রাতে রেস্টহাউসে ফেরার পর দেখা পেলাম একটি প্যাঁচার। রাতের অন্ধকারে এটি উড়ে এসে বসেছে একটি লাইট পোস্টের ওপর। ঘাড় ঘুরিয়ে, চারদিকে প্রখর দৃষ্টি। খাবার চাই। উড়ন্ত পোকা পেলেই ধরে ফেলবে। হাতে থাকা টর্চের সুইচ অন করে বোঝা গেল, এটি খয়রা শিকড়ে-প্যাঁচা। দেশের বন ও প্রত্যন্ত বৃক্ষবহুল গ্রাম এলাকায় এদের বসবাস। কিছুক্ষণ পর প্যাঁচাটি উড়ে গেল।
খয়রা শিকড়ে-প্যাঁচা মসৃণ বাদামি পালকে আবৃত নিশাচর পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ৩২ সেন্টিমিটার। পিঠে বাদামি রঙের পালক আছে। দেহের নিচের অংশের পালকের রং লালচে বাদামি। কপালে একটি সাদা দাগ থাকে। অন্যান্য প্যাঁচার সঙ্গে এটির ব্যতিক্রম হলো, এ প্রজাতির লেজ লম্বা এবং লেজের পালকে চওড়া কালো বাদামি ডোরা থাকে। চোখ উজ্জ্বল-হলুদ, পা ও পায়ের পাতা অনুজ্জ্বল হলুদ বা হলদে সবুজ। পুরুষ ও স্ত্রী পাখির চেহারা দেখতে একই রকম। প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই এরা বেরিয়ে পড়ে। খাবার ও দৈনন্দিন কাজের জন্য এরা পুরো রাতই কর্মব্যস্ত থাকে। তবে প্রকৃতি কালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে গেলে ওড়াউড়ি করে।

এরা সচরাচর একা বা জোড়ায় বিচরণ করে। রাতে আবাসের চারদিকে শিকার খোঁজে এবং লম্বা নখরের সাহায্যে শিকার ধরে খায়। খাদ্যতালিকায় রয়েছে ছোট উড়ন্ত পোকা, ব্যাঙ, টিকটিকি, কাঁকড়া, খুদে বাদুড়, ছোট পাখি, মেঠো ইঁদুর ইত্যাদি।

পূর্ণিমার রাতে এরা একনাগাড়ে মনোহর সুরে ডাকে। দিনে ছায়াঢাকা গাছের ডালে ঘুমিয়ে সময় কাটায়। মাঝেমধ্যে অন্য পাখিরা এসে ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। মার্চ-জুন মাসে প্রজননের মৌসুমে গাছের কোটরে বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে। ডিম সাদা। ২৪ দিনে ডিম ফুটে ছানা বের হয়। স্ত্রী পাখি একাই ডিমে তা দেয়। সে সময় পুরুষ পাখি খাবার সংগ্রহ করে এবং স্ত্রী পাখিকে সরবরাহ করে। মা-বাবা দুজন মিলেই ছানাকে খাওয়ায় এবং লালন-পালন করে।

খয়রা শিকড়ে-প্যাঁচার ইংরেজি নাম Brown Hawk Owl । এটি বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের সব বিভাগের বনে ও গ্রামে দেখা যায়। পাকিস্তান ও মালদ্বীপ ছাড়া পূর্ব দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় দেখতে পাওয়া যায়।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/988399/%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%9C%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%81%E0%A6%9A%E0%A6%BE

মহাবিপন্ন কুড়াবাজ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর বাজার থেকে ট্রলারে চেপে পাতলাই নদী দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পর মেন্দিপাতা গ্রামের সামনে এসে থামলাম। নৌকার ছাদের যেখানটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, তার ঠিক উল্টো পাশে একটা বড় ন্যাড়া গাছের মগডালে পাখির বিশাল এক বাসা দেখলাম। এত বড় বাসা জীবনে কম দেখেছি। মিনিট দুয়েক মাত্র অপেক্ষা করেছি, এর মধ্যেই বিশাল আকারের এক ইগলকে বাসার দিকে আসতে দেখা গেল। ওড়ার ভঙ্গি ও দেহের আকার দেখে ওকে চিনতে অসুবিধা হলো না। বিশাল পাখিটি নামার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় কিছু একটা নড়েচড়ে উঠল। আর মুহূর্তেই আরেকটি পাখি বাসার ভেতর থেকে যেন জেগে উঠল! ওর চেহারা এবং পালকের রংই বলে দেয় যে ও একটি ছানা। কয়েকটি ছবি তুললাম।
এরা এ দেশের এক মহাবিপন্ন পাখি কুড়াবাজ (Pallas’s Fish Eagle, Pallas’s Eagle বা Band-tailed Fish Eagle)। কুড়া, কুড়ল, কোড়ল বা পালাস-এর কুড়া ইগল নামেও পরিচিত। Accipitridae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Haliaeetus leucoryphus।
প্রাপ্তবয়স্ক কুড়াবাজের দৈর্ঘ্য ৭০ থেকে ৮৫ সেন্টিমিটার এবং প্রসারিত ডানা ১৮০ থেকে ২০৫ সেন্টিমিটার। আকারে স্ত্রী কিছুটা বড়। দেহের রং ঘন বাদামি। স্ত্রী ও পুরুষের পালক একই রঙের। তবে ঘাড় ও মাথা হালকা হলদেটে থেকে সাদা এবং কাঁধ-ঢাকনি কিছুটা গাঢ়। পিঠ কালচে-বাদামি, দেহের নিচটা লালচে-বাদামি। ডানার নিচটা কালো। কালো লেজে চওড়া সাদা টান। চোখ হলুদ। বাঁকানো ঠোঁটটি হলুদাভ ও আগা কালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পুরো দেহ গাঢ় বাদামি। ঠোঁট ছোট ও কালচে-ধূসর। লেজ লম্বা এবং তাতে কোনো সাদা টান নেই।
কুড়াবাজ দুর্লভ আবাসিক পাখি। বর্তমানে বিশ্বে সংকটাপন্ন এবং বাংলাদেশে মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। সিলেট, ঢাকা ও খুলনা বিভাগের হাওর, বিল ও উন্মুক্ত জলাভূমিতে বাস করে। সচরাচর জোড়ায় থাকে। গাছ কিংবা মাটিতে বসে বা আকাশে উড়ে খাদ্য খোঁজে। মাছ মূল খাদ্য। তবে সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপ, জলচর পাখি এবং মরা প্রাণীও খায়। লম্বা নখ দিয়ে পানি থেকে শিকার তুলে নেয়। কখনো কখনো উড়ন্ত হাঁসের ঝাঁক থেকে কোনো একটিকে নখে গেঁথে নেয়।
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি প্রজননকাল। সারা জীবনের জন্য জোড় বাঁধে। জলার কিনারায় বড় কোনো গাছের মগডালে ডালপালা ও ঘাসপাতা দিয়ে বিশালাকৃতির মতো বাসা বানায়। একই বাসা বছরের পর বছর ব্যবহার করে। সাদা রঙের ২ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে তা দিয়ে ৪০ থেকে ৪৫ দিনে বাচ্চা ফোটায়। নীল আকাশে ডানা মেলতে বাচ্চাদের ৭০ থেকে ১০৫ দিন সময় লাগে। এরপরও বাচ্চারা আরও মাস খানেক বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। আবাসভূমি কমে যাওয়া, বড় গাছের অভাব, ফসলের খেতে কীটনাশকের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে দিনে দিনে সংখ্যা হ্রাস পেয়ে বর্তমানে এরা মহাবিপন্ন পর্যায়ে চলে এসেছে।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/987196/%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AA%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A7%81%E0%A7%9C%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%9C

শরতে কাশের সমারোহ

স্বপ্ন ও শুভ্রতার প্রতীক হয়ে শরৎ আসে। বর্ষার অঝোরধারার পর শরতের সতেজ মাটিতে গাছপালা খুঁজে পায় ঝলমলে রোদ। পথের দূর্বাঘাসে শিশিরের আলপনা জাগে। আমাদের ডেকে যায় শরতের শান্ত প্রকৃতি গাঢ় নীল আকাশ ও শুভ্র প্রাণের কাশফুল।
এখন দূরতর আকাশে মেঘের দল ভেঙে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে নীলের উজ্জ্বলতা। শরতের সেই শুভ্র মেঘের নরম নীল আকাশ আবার এসেছে ফিরে। বাংলার কোনো বয়ে চলা নদীর চরে ফুটেছে শুভ্র নরম কাশফুল। যে শুভ্রতা ছুঁয়ে গেছে আমাদের মনে ও বাংলার রূপে। নদীতীরে বাতাসে ঢেউখেলা সেই কাশের সারি, কাশফুল ছুঁয়ে দুরন্ত শিশুর মায়াবী হাসি, কাশবনে বাবুই, মুনিয়া পাখিদের ওড়াউড়ি দুই চোখ ভরে দেখে নিচ্ছে মানুষ।
কাশ বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফুলের মধ্যে একটি। একটি ঘাস তার ফুল দিয়ে আমাদের মন জয় করে নিয়েছে। আমাদের শিখিয়েছে কোমলতা ও সরলতা। পৃথিবীতে কোনো ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের ফুলের এত কদর এবং মানুষের জয় করে নেওয়ার এই আবেদন আছে কি না, জানা নেই। বাংলা সাহিত্যে এ ফুলের উপস্থিতিও ব্যাপক।
ঢাকার আকাশে শরতের বিকেলে দেখা যায় ভুবন চিলের ডানাগুলো। তবু এই শরতে আমাদের মন ছুটে যায় সবুজ ঘাসের ওপর নুয়ে পড়া কাশবনে। শরতের উদ্ভিদরাজ্যে নীলের নীলিমা কম, শুভ্রতাই বেশি। তবে সে অভাব ঘুচিয়ে দেয় নীলাকাশ।
কাশ ঘাস পরিবারে ফুল। সাধারণত নদীর চরে কাশবন দেখা যায়। আমাদের দেশে সাধারণত তিন প্রজাতির কাশ রয়েছে। সমতলে এক প্রজাতি এবং পাহাড়ে দুই প্রজাতি। তবে সবার কাছে সমতলের প্রজাতিটি প্রিয় এবং সহজে দর্শনযোগ্য। ঢাকার চারপাশে ভূমিদস্যুদের আবাসন প্রকল্পের নামে প্রাকৃতিক জলা বালু দিয়ে ভরাট করার ফলে আমাদের অনেক জলজ প্রজাতির পাখি অন্যত্র চলে গেছে। তবে এসব বেলাভূমিতে এখনো কাশের প্রাধান্য বেশি। নদীর বালুমাটির সঙ্গে কাশের বীজ চলে আসায় এসব জায়গায় এ ঘাস সহজেই জন্মায়। শরতে উত্তরা, বসুন্ধরা, পূর্বাচল, কেরানীগঞ্জ এলাকায় গেলে কাশবন দেখা যাবে। এসব কাশবন কোনো কংক্রিটের স্থাপনায় অচিরেই ঢেকে যায়।
কাশ ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম saccharum spontaneum। ইংরেজি নাম Kans grass। বাংলাদেশের নোনাজলের নদীমোহনা বাদে প্রায় সব নদীর চরে, প্রাকৃতিক জলাশয়ের ধারে কাশ জন্মে। ভাদ্র-আশ্বিনের প্রকৃতিতে শরৎ আকাশজুড়ে নরম সাদা মেঘের ভেলা হয়ে ঘুরে বেড়ায় পালতোলা নৌকার মতো, হেমন্তের কার্তিকেও শরতের রেশটুকু যেন শেষ হতে চায় না।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/985522/%E0%A6%B6%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%B9

ফটিক সিন্ধু প্রজাপতি

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটে মাত্র ঢুকেছি। বনের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে একটি ছড়া, তার ওপর ছোট্ট সেতু। কিন্তু সেতুর ওপর দিয়ে না গিয়ে নিচের ক্ষীণধারার ছড়ায় নেমে পড়লাম। গোড়ালি সমান পানি। ছড়ার স্বচ্ছ ও টলটলে এই পানিতে পা ভেজাতেই মুহূর্তের মধ্যে যেন পুরো দেহ শীতল হয়ে এল। হঠাৎই পাশের বালুতটে চোখ গেল। ওখানে যেন বাহারি রঙের প্রজাপতির মেলা বসেছে! প্রায় সকলেই ভেজা বালুর রস চুষতে ব্যস্ত। এতক্ষণ পানিতে হাঁটাহাঁটি করতে করতে খেয়ালই করিনি। বাহারি সব প্রজাপতির মেলায় কালো-নীল-সবুজ এক প্রজাপতি আমার মন কাড়ল। কিন্তু দু-তিনটি ক্লিকের পরই সে উড়ে গেল। এরপর অস্থিরভাবে ওড়াউড়ি করতে থাকল। বালু বা পাশের ঝোপঝাড়ে একবারের জন্যও বসল না। তবে ছবি ভালো হলো, তাই মনে কোনো খেদ রইল না। পরে সাতছড়ি ও লাউয়াছড়ায় বেশ কয়েকবার এই প্রজাপতি দেখেছি।
এরা এ দেশের দুর্লভ এক সুন্দর প্রজাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক ড. বাশার ওদের নাম দিয়েছেন ফটিক সিন্ধু (Common Bluebottle বা Blue Triangle)। পশ্চিমবঙ্গে এটি তুঁতচিল নামে পরিচিত। Papilionidae পরিবারভুক্ত প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Graphium sarpendon।
প্রসারিত অবস্থায় ফটিক সিন্ধুর সামনের এক ডানার প্রান্ত থেকে অন্য ডানার প্রান্ত পর্যন্ত দৈর্ঘ্য ৮০-৯০ মিলিমিটার। ডানা ও দেহের ওপরটা কালো ও নিচটা বাদামি। সামনের ডানার শীর্ষ থেকে পেছনের ডানার ভেতরের প্রান্ত পর্যন্ত ওপর ও নিচে একটি ফ্যাকাশে সবুজ বা নীলচে-সবুজ থেকে গাঢ় নীল ডোরা চলে গেছে। পেছনের ডানার নিচের কিনারার দিকে এক সারি নীল ফোঁটা, অতিরিক্ত এক সারি লাল ফোঁটা ও ডানার গোড়ায় একটি লাল ফোঁটা রয়েছে। লম্বালম্বি সাদা ডোরাসহ দেহ ধূসর। শুঙ্গ (অ্যান্টেনা) ও চোখ কালো। শুঁড় ও পা ধূসর। পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাপতি দেখতে একই রকম।
ফটিক সিন্ধু সচরাচর কম দেখা যায়। মূলত ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বন ও বনের কিনারা, উন্মুক্ত তৃণভূমি, ফুলের বাগানে বিচরণ করে। এরা বেশ চটপটে। দ্রুততার সঙ্গে গাছের ওপরের দিকে ওড়ে। বিভিন্ন ধরনের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ফুলের রস পান করে।
স্ত্রী দেবদারু, কর্পূর, দারুচিনি, অ্যাভোকাডো প্রভৃতি গাছের কচি পাতার ওপর পাতাপ্রতি একটি করে হলদে ও গোলাকার ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে তিন দিনে। শূককীট প্রথম দিকে কালচে বা গাঢ় সবুজ হলেও পরে সবুজাভ হয়। ১২ দিনে পাঁচবার রূপান্তরিত হয়ে শূককীট সবুজ রঙের মূককীটে পরিণত হয়। ১০ দিন পর মূককীটের খোলস কেটে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বের হয়ে নীল আকাশে ডানা মেলে।
বাংলাদেশ ছাড়াও পুরো ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও অস্ট্রেলিয়ায় এদের দেখা যায়।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/982492/%E0%A6%AB%E0%A6%9F%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A7%E0%A7%81

গো–বক পাখি

একটানা মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে, একটি মহিষ খালপাড়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে চুপচাপ। অসহায়ভাবে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা মহিষটির পিঠে এক সারিতে দাঁড়িয়ে পাঁচটি বকও ভিজছে চুপচাপ। স্থির মহিষ ও বক। দৃশ্যটি দারুণ!

এই বকগুলো হলো আমাদের অনেকের চেনা পাখি গো-বক। গাই বগলা নামেও পরিচিত এরা। চালচলনে গোবেচারা ধরনের লাগলেও দুঃসাহসী, লড়াকু ও মেজাজি। সতর্ক, চতুর ও কুশলীও বটে। ইংরেজি নাম Cattle Egret। বৈজ্ঞানিক নাম Bubulcus ibis। দৈর্ঘ্য ৫০ সেন্টিমিটার। ওজন ৪৬০ গ্রাম। মাটির ওপর বা ঘাসবনের ভেতর দিয়ে যেমন মার্চ করতে পারে, তেমনি উড়ন্ত পোকা-পতঙ্গকে লাফ দিয়ে শূন্য থেকে পেড়ে ফেলতে পারে অ্যাক্রোব্যাটদের কৌশলে। মূল খাদ্য এদের পোকামাকড়, গিরগিটি, ব্যাঙ, টিকটিকি; গরু-মহিষ-ভেড়া-ছাগলের শরীরের পরজীবী পোকা-কীটসহ
আটালি ও ডাঁশ মাছি। জোঁক এরা খায় না। তবে গবাদিপশুর নাকের ভেতরে, খুরের ফাঁকে, তলপেটে জোঁক লাগলে সেগুলো এরা টেনে বের করে ফেলে শালিকদের মতো। নাকের ভেতরে জোঁক ঢুকলে গবাদিপশু ‘হ্যাঁচ্চো’ দিতে থাকে। শালিক ও গো-বকেরা আসে। পশুটি মুখ নামিয়ে দেয়। নাকের ভেতরে ঠোঁট ঢুকিয়ে দিয়ে বের করে আনে জোঁক। জোঁকেরাও অতি বুদ্ধিমান। গবাদিপশুর এমন সব জায়গায় লাগে, যেখানে পশুটি জিভ দিয়ে চাটতে পারবে না, চাটা দিলে জোঁকের বাবারও সাধ্য নেই লেগে থাকে। গো-বক তাই গবাদিপশুর পরম বন্ধু। গবাদিপশু কাত হয়ে শুয়ে আছে, গো-বক কানের ভেতরের বা শিংয়ের গোড়ার আটালি বের করে খাচ্ছে—বাংলায় আজও এটি সাধারণ দৃশ্য। গবাদিপশু ঘাসবনে চরছে, নড়ছে ঝোপঝাড়, উড়ছে পোকামাকড়, খাচ্ছে গো-বকেরা। এটিও চিরচেনা দৃশ্য। এমনিতেও গো-বকেরা ঘাসবনে পাশাপাশি দলবেঁধে হাঁটে, নিজেরাই পা ও পাখা দিয়ে ঝোপঝাড়-ঘাস নাড়ায়, পোকামাকড় বের হলেই পাকড়াও করে। ঘাসবনের ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে এরা দুই পাখার বাতাস ঢেলে পোকামাকড় বের করার কৌশল জানে। শুধু পোষা প্রাণী নয়, বুনো শূকর, হরিণ, হাতি ইত্যাদির সঙ্গে একই কারণে বন্ধুত্ব গো-বকের। এরা দিবাচর। তবে প্রয়োজনে নিশাচর হতে পারে।

প্রজনন মৌসুমে গো-বকের ঠোঁট-মাথা-ঘাড়-বুক সোনালি-হলুদ হয়, ঘাড়-গলা-পিঠ-বুকে সুতা পালক গজায়। যেন সোনার সুতা। এমনিতে এদের রং বরফসাদা।

বাসা করে গাছের ডালে। কলোনি বাসা। ডিম দেয় তিন থেকে পাঁচটি। দুজনেই তা দেয়। ডিম ফোটে ২০ থেকে ২৫ দিনে। ঢাকা শহরেও বাসা করে।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/984481/%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%BE%E2%80%93%E0%A6%AC%E0%A6%95

নীল বনলতা ফুল

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে যেতে যেতে অনেক অদেখা ভুবন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, বহু দূরের নীলাকাশ, যা মিশে গেছে পাহাড়ের চূড়ায়। এখানে মেঘ আর পাহাড়ের অভিসার চলে নিত্যদিন। কোথাও মেঘ জমে আছে সবুজ পাতাকে আড়াল করে, কোথাও আবার উঁচু-নিচু পাহাড়ের ঢালে জুম ফসল কাটছেন আদিবাসী নারীরা। অচেনা পাখিরা উড়ে চলেছে। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। চোখ জুড়িয়ে যায়। রাঙামাটি থেকে খাগড়াছড়ি অথবা রুমা থেকে কেওক্রাডং পাহাড়ে যেতে যে সড়ক রয়েছে, সে সড়কের চারপাশে এ দৃশ্য চোখে পড়ার মতো।
পাহাড়ের গায়ে জন্মানো লতা-গুল্মে ফুটে আছে নাম না-জানা অনেক ফুল। পাহাড়ের পথে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখ আটকে গেল নীলচে এক ফুলের আকর্ষণে। সাদাটে নীলচে ফুলগুলো ছাপিয়ে আছে পাহাড়ি টিলার গা বেয়ে বেড়ে ওঠা লতায়। অপূর্ব এক উচ্ছ্বাসের ভঙ্গিতে ছেয়ে আছে চারপাশ। ফুলটির নাম নীল বনলতা। নীল লতা বা নল লতা নামেও কেউ কেউ এ ফুলকে চেনেন। বাংলাদেশের সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে এই প্রজাতির দেখা মেলে বেশি। লাউয়াছড়া, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান, রেমা কালেঙ্গা বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য, কাপ্তাইয়ের রাম পাহাড়, চিম্বুক পাহাড়ে নীল বনলতা ফুলের শোভা দেখা যায়। শেরপুরের শালবনে গিয়েও এ লতার দেখা পেয়েছি। তবে এখানে লতার ঝাড় বেশি নেই।
এ লতা ভূমি থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে ৮-১০ মিটার ওপরে ওঠে। পাতার বোঁটা মোড়ানো। পাতা রুক্ষ, আগা চোখা। লম্বা লতা। পাপড়ি নলাকার, পাকানো, পুংকেশর চারটি, দলের সঙ্গে লাগানো থাকে। ফুল লম্বা, ঝুলন্ত ডাঁটায় ফুল ফোটে এক বা একাধিক। ঘণ্টার মতো ফুলের গড়ন। পাপড়ি পাঁচটি, অসমান হালকা নীল, ছয় সেন্টিমিটার লম্বা। ফুল ফোটে মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। পাতা সবজি হিসেবে আদিবাসীরা ব্যবহার করে। এ লতার অনেক ভেষজ গুণ রয়েছে। বৈজ্ঞানিক নাম thunbergia grandiflora, ইংরেজি নাম Bengal clock vine। উদ্যানে কিংবা বাড়ির ছোট্ট বাগানে ঝাঁকা কিংবা মাচা তৈরি করে এদের লাগানো হলে ফুলের রং দেখে আপনার প্রাণ জুড়িয়ে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ফুলের কদর আছে। উন্নত বিশ্বে গার্ডেন প্ল্যান্ট হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছে এই নীল বনলতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের উদ্ভিদ উদ্যানে ও ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানে এ লতা রয়েছে এবং ফুলও ফোটে। আমাদের কাছের পাহাড়ে এই বনফুল বছরের প্রায় নয় মাস মেলে ধরে থাকে সৌন্দর্য। এটি বাগানের জন্য খুবই উপযোগী একটি ফুল। আমাদের নিজস্ব এ বনলতা দিয়ে আমরাও সাজাতে পারি আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যান।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/981379/%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%B2-%E0%A6%AC%E0%A6%A8%E0%A6%B2%E0%A6%A4%E0%A6%BE

বাংলাদেশে নদীর পানি সবচেয়ে দূষিত

এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে নদীর পানি সবচেয়ে বেশি দূষিত হচ্ছে বাংলাদেশে। আর নদী অববাহিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অবনতি হয়েছে নেপাল, ভারত, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া গঙ্গা অববাহিকার পানি। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ‘এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই অঞ্চলের দেশগুলোর পানিসম্পদের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে জাতীয় পানি নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থানকে বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৮টি দেশের মধ্যে তুলনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এতে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে মাটির ওপরের ও নিচের—দুই ধরনের পানিরই অবস্থা খারাপ। মাটির নিচের পানি উত্তোলনের ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতাও বাংলাদেশে অনেক বেশি।

প্রতিবেদনে জাতীয় পানি নিরাপত্তা ইনডেক্সে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে থাকা দেশগুলো হচ্ছে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশ কিরিবাতি।

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে এডিবির জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ব্যাং ব্যাং সুসানটোনো বলেন, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল পানি নিরাপত্তার দিক থেকে পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। পানি খাতের সুরক্ষা ছাড়া এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখা যাবে না।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলোর ৮০ শতাংশ পয়োবর্জ্য কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই পানিতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে নদীগুলোতে রাসায়নিক পদার্থের দূষণ বাড়ছে। নদীর স্বাস্থ্য দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। নদীর স্বাস্থ্যের অবনতির দিক থেকে শীর্ষে গঙ্গা অববাহিকার দেশ ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল।

ভূগর্ভের পানির অতিব্যবহার

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ প্রতিবছর ভূগর্ভ থেকে ৩০ দশমিক ২১ ঘন কিলোমিটার (কিউবিক কিলোমিটার) পানি উত্তোলন করে। এর ৮৬ শতাংশই ব্যবহৃত হয় কৃষির সেচকাজে। বাকি ১৩ শতাংশ গৃহস্থালি কাজে ও ১ শতাংশ পানি শিল্পের কাজে ব্যবহৃত হয়। ভূগর্ভের পানি অতিব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ। ভূগর্ভের পানি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে ভারত। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ইরানের অবস্থান। ভূগর্ভ থেকে অতিমাত্রায় পানি উত্তোলনকে টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করছে এডিবি।

তবে এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভূগর্ভ থেকে মোট উত্তোলিত পানির যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তার চেয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের পরিবেশবিষয়ক পরামর্শক ইফতেখারুল আলম। তিনি এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১৬ লাখ বিদ্যুচ্চালিত সেচযন্ত্র ও ৩০ হাজার গভীর নলকূপের মাধ্যমে বছরে ৪৮ থেকে ৫২ কিউবিক কিলোমিটার পানি উত্তোলন করা হয়। এই প্রবণতা দেশের বরেন্দ্রসহ বিভিন্ন এলাকার পানির স্তর বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালের কৃষকেরা ২ কোটি ৩০ লাখ সেচপাম্পের মাধ্যমে তাঁদের সেচের পানি উত্তোলন করেন, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামিয়ে দিয়ে বড় ধরনের পরিবেশগত ঝুঁকি তো তৈরি করছেই, সেই সঙ্গে এই পানি তুলতে তাঁদের বছরে ৩৭৮ কোটি ডলার খরচ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হাফিজ উল্লাহ এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের হিসাবে পাঁচ বছর আগে দেশের ভূগর্ভ থেকে উত্তোলন করা ৮২ শতাংশ পানি সেচকাজে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে তা কমে ৭৭ শতাংশ হয়েছে। সরকার ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারে নানা ধরনের উদ্যোগ নেওয়ায় সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।

পানি নিরাপত্তা

জাতীয় পানি নিরাপত্তা ইনডেক্সের তালিকায় ৪৮টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে যথাক্রমে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুর। নিচের দিক থেকে শীর্ষে বা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে আফগানিস্তান। ৪৬, ৪৫ ও ৪৪তম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ।

প্রতিবেদনটিতে জাতীয় পানি নিরাপত্তা ইনডেক্স তৈরি করা হয়েছে যে পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে সেগুলো হলো গৃহস্থালি পানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পানি নিরাপত্তা, নগরের পানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত পানি নিরাপত্তা ও পানিসংক্রান্ত দুর্যোগ সহিষ্ণুতা।

প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ওয়ালি উল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এখনো প্রতিবেদনটি দেখিনি, তাই না দেখে কোনো মন্তব্য করব না।’

পানিবিষয়ক এই প্রতিবেদন তৈরির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এডিবির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা এক হাজার কোটি হবে। বিশ্বের প্রধান শহরগুলোতে খাবার ও পানির চাহিদা বাড়বে। এই সময়ের মধ্যে গৃহস্থালি কাজে পানির চাহিদা ৫৫ শতাংশ ও কৃষিতে ৬০ শতাংশ বাড়বে। ফলে পানির টেকসই ব্যবহার এবং পানির উৎসগুলো সংরক্ষণের দরকার হবে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পানি নিরাপত্তার চিত্র তুলে ধরতেই এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/977758/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%A6%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%B8%E0%A6%AC%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%82%E0%A6%B7%E0%A6%BF%E0%A6%A4

বিলচোরা পাখি

বিশাল চরভূমিটার কিনারার জল ছুঁয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে পাখিটি। বেঢপ-মোটা গাঁইতির মতো ঠোঁট দিয়ে শিকার গাঁথছে ঠোঁটে। জেলে নৌকার বালক মাঝি নৌকা থেকে নেমে হাঁটুজল ভেঙে উঠল গিয়ে চরভূমিটায়। পাখিটা ঘাড় বাঁকিয়ে টানটান শরীরে তীক্ষ্ণ চোখে দেখছে বালককে। কাছাকাছি গিয়ে খেলাচ্ছলে বালক ঝেড়ে দৌড় দিল পাখিটির দিকে। পাখিটাও দ্রুত বেগে দৌড় শুরু করল বিপরীত দিকে। থামল বালক। এমুখো হয়ে থেমে গেল পাখিটাও। ওই পাখিটা দারুণ চতুর ও তুখোড় অভিনেতা। বউটি আরও বেশি দক্ষ অভিনেত্রী। বালুচরেই খোঁদলমতো জায়গায় দু-তিনটি বালু বা পাথর-রঙা ডিম পাড়ে, ডিমে লালচে-বাদামি ভাব থাকে, ছিটছোপ থাকে। ওই সময়ে মেয়েটি বলতে গেলে একাই ডিমে তা দেয়, পুরুষটি থাকে কড়া পাহারায়। ওই সময় কেউ এগোতে থাকলে মেয়েটি বাসা ছেড়ে আহত হওয়ার অভিনয় করে—যেনবা ভেঙে গেছে একখানা ডানা। খোঁড়া হয়ে গেছে একখানা পা। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে বাসা থেকে দূরে গিয়ে মাটিতে কাত হয়ে ছটফট করে। পুরুষটি যায় বউয়ের কাছে। শত্রু বা যেকোনো মানুষ ওদের দিকে এগোলে, তখন আবার দৌড়াবে। ওড়ে না সহজে, তবে ওড়ার আগে প্রায় ক্ষেত্রেই বিমানের রানওয়ে ধরে ছোটার কায়দায় ছুটবে, তারপরে মেলবে পাখা। ওদের দৌড়ে আছে চমৎকার তাল-লয়-ছন্দ।
এলাকার কজন জেলে আমাকে পাখিটির নাম বলেছিলেন হাঁটুভাঙ্গা, চরমুরগি, ঢেঁকিচ্যাগা ও বাঁটালিচ্যাগা। এই কটি নাম আমি আরও কজন জেলে ও বনজীবীর কাছে শুনেছি। কেতাবী নাম বিলচোরা। ইংরেজি নাম Great thick-knee। বৈজ্ঞানিক নাম Esacus recurvirostris। দৈর্ঘ্য ৫১ সেন্টিমিটার। দেখতে আকারে-গড়নে অনেকটাই আমাদের দেশি মুরগির মতো। তবে পা দুখানা বেশি লম্বা। সুন্দর এই পাখির চোখ-মাথা-কপাল ও মুখমণ্ডলে চমৎকার রঙের মিশেল। হলুদ চোখের উপরিভাগ দিয়ে অর্ধচন্দ্রের মতো সাদা টান, চোখের নিচ দিয়ে চওড়া কালো টান, ডানা ও গলার দুপাশ সাদা, চোখের নিচে একটা ছোট কালো টান, মোটা ঠোঁটের গোড়াটা হলুদ, পা দুখানাও আলতা-হলুদ বা কমলা-হলুদ। কপাল সাদা। একনজরে শরীরের উপরিভাগ বাদামি। চকচকে সাদাটে-বাদামি নিচের দিকটা। বিশ্রামের সময় এরা চরভূমিতে বসে হাঁটু মুড়ে, ঠোঁট বালুতে গেড়ে দিয়ে তার ওপরে মাথার ওজন ভর করে। অভিনয়ের সময়েও এরা একখানা হাঁটু মুড়ে ল্যাংচায়। এদের ওড়ার ধরন বুনো হাঁসদের মতো।
মূল খাদ্য বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়া। ঠোঁট দিয়ে যেন কুড়াল বা গাঁইতি চালিয়ে এরা কাঁকড়ার দাঁড়া ভেঙে ঘিলু ও অন্যান্য তরলজাতীয় খাবার খায়। কৌশলে কাঁকড়ার সাঁড়াশি (চিমটি) এরা পা দিয়ে ভেঙে ফেলে। খাদ্যতালিকায় আরও আছে মাছ-শামুক, পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ, ছোট সাপ, পাখির ডিম, ইঁদুর ইত্যাদি। এরা দৌড়বিদ ও ভালো সাঁতারু পাখি। আবার বুনো হাঁসের মতো জলে ভাসতেও ভালোবাসে।
মূলত দ্বীপ-চর-মোহনার পাখি। সুন্দরবন অঞ্চলে দেখা মেলে। এরা আমাদের দেশের বিরল আবাসিক পাখি। চরতে পছন্দ করে শেষ বিকেল-গোধূলি ও ফুটফুটে জোছনা রাতে। প্রজনন মৌসুম ফাল্গুন থেকে আষাঢ় মাস পর্যন্ত। ডিম ফুটে ছানা হয় ২৬-২৭ দিনে। এ সময় উড়ে উড়ে খুশিমনে দুটিতে মিলে ডাকাডাকি করে।

Source: http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/977194/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%B2%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE